১৯৯৫ সালে মার্চ মাসে বিয়ে করতে হয়। আমার প্রয়োজন ছিল বিবাহ। বিবাহ মানে একটা সম্পর্ক। একজন নারী শুধু বিছানার সঙ্গী হিসেবে কিন্তু আসে না। জীবন সঙ্গিনী হিসেবেই আসে। বাবা যে চাকরি করতেন সেখানে পেনশন ছিল মেরে কেটে দুহাজার। আর নতুন বউ প্রথম দিন শ্বশুর বাড়িতে এসেই রান্নাঘরের হালটা ধরেছিল। কারণ আমার মা মারা গিয়েছিলেন অনেক আগে। প্রেম-ট্রেম কি ছিল জানিনা। শ্বশুর মশাই তার ঘাড় থেকে তার বড় মেয়েকে নামাতে চাইছিলেন, আমিও ভালবাসার জালে যখন আষ্টেপৃষ্টে বাঁধা পড়েছি, তার প্রয়োজনীয়তা জীবনের সর্বক্ষেত্রে প্রার্থনা করেছিলাম।
বিয়ের সময় যেমন কন্যার ফিরিস্তি দেওয়া হয় তেমনি পাত্রেরও ফিরিস্তি দেওয়া হয়। Sales Executive. আসল কথা আমি কিছুই করি না। আমি বেকার সেটা সবসময় শুনেছি। যে কারো জন্য কিছু করে না তার নাম বেকার। যদি এই সংজ্ঞাটা ধরে নিই তবে আমাদের শিক্ষিত সমাজের মধ্যে অনেকেই বেকার। যারা দেখেও দেখেনা যারা শুনেও শোনে না। অর্থ উপার্জন মানেই সাকারত্ত্ব নয়।
যাইহোক ১৯৯৫ সালের নভেম্বর মাস। আমি রাসমেলায় একটা টেবিল বসিয়ে নানা রকম কলমের সম্ভার হাজির করেছি। আমি কলম ব্যবসায়ী। আমি যে দুটো মডেল বাজারে এনেছি, মানুষ না নিয়ে পারবে না! গ্যারান্টি!! আমি দেখেছি সেদিন। আমার স্ত্রী, আমার শ্যালিকা, আমার শাশুড়ি, আমার শ্বশুর বাড়ির লোকজন আমার সেই ছোট্ট টেবিলের সামনে দিয়ে হেঁটে চলে গেছেন টেবিলটাকে আড়চোখে দেখে। রাসমেলার ময়দানে আমি স্বপ্নের ফেরিওয়ালা । কল্পনা করি। প্রত্যেকের বুকে থাকবে এই ব্রান্ড !!! আমি কিন্তু আমার কর্মে অবিচল। 100% ডেডিকেটেড পার্সন আমি।
তারপর পেশা পরিবর্তন করেছি। ক্যাটারিং নামের যে শিল্পটায় কোটি কোটি টাকা ওড়ে, ( যে ব্যবসাটা মন দিয়ে করা হোল না) সেই ব্যবসার কুচবিহারে আমি ছিলাম তৃতীয় ব্যক্তি। পুজোর সময় রাস্তার ধারে দোকান দিয়েছি। যা করেছি ১০০ শতাংশ নিবেদন করেছি। ফাঁক রাখলে লোককে ছোঁয়া যায় না। এও শুনেছি আমার পরিবার-পরিজন একথাও বলেছে আমি রাস্তার ধারে চায়ের দোকান দিয়েছি। একটা চাকরি বাকরি থাকলে নাকি আমার ভালো হতো!! সে সেলারি যাই হোক না কেন!! আল্টিমেট গোল হচ্ছে চাকরি!!!
সে সুট বুট পরিহিত সিকিউরিটি হোক বা কর্পোরেট সেক্টরের টাই পড়া পিয়নই হোক!! যাই হোক না কেন !! চাকুরীজীবি চাই!!! কন্যাদায়গ্রস্ত পিতার পাত্রের চাকরি হওয়া আবশ্যক।
সকালে বা বিকালে একটু চা খাওয়ার জন্য আমি সাগরদিঘির পূর্ব প্রান্তে বা স্টুডেন্ট হেলথ হোমের বিপরীতে গিয়ে দাঁড়াই।
দুজন চা বিক্রেতাকে দেখি। কাগজের কাপ ও বা মাটির ভাড়! অনবরত বিক্রি হয়েই চলেছে সেই চা! আমি খুব নিশ্চিত না হয়েও বলতে পারি দৈনিক বিক্রি পাঁচ হাজার ছাড়াবে। চা কে বিপনন করার অসাধারণ আইডিয়া!! আমি নিশ্চিত। আমার থেকে তার রোজগার বেশী!! অবাক হবার কিছু নেই
চা বিক্রেতাকে আমাদের সমাজ সম্মান দেন না। এখনও। দিল্লির রাজেন্দ্রনগর এলাকায় আমি দেখেছি বিভিন্ন ধরনের খাদ্যের দোকান। সেখানে ক্যাশ ট্রানজাকশন হয় না বললেই চলে । সবাই ফোন পে, গুগুল পে, পেটিএম এর বারকোড ডিসপ্লে করেছে সামনে। সে দু টাকাই হোক না কেন!! সেই সমস্ত রাস্তার ফেরিওয়ালারা যে ধরনের গাড়ি চড়ে আমরা স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারি না।
প্রশ্ন হচ্ছে ঘুগনির কথা। আলু ভাজার কথা। তেলে ভাজার কথা। আমাদের মুখ্যমন্ত্রী সহজ সরল ভাবে মুখ ফুটে সত্যি কথাটা বলে দিয়েছেন। শেষে একথাও বলেছেন মানুষ কিন্তু এভাবেই বড় হয়।সোজাকে বাঁকা করে দেখা এ শুধু বাঙ্গালীই জানে। অন্য কোন জাতি জানেনা।( ক কলোনিয়াল আটিচিউড থেকে আমরা এখনও বের হতে পারিনি) না হলে পান মশলার বিজ্ঞাপনে সালমান খান বা অমিতাভ বচ্চনকে দেখা হতোনা। আমরা দেখছি।
আজকে অভিজিৎ গাঙ্গুলির সাক্ষাৎকার দেখছিলাম। তাঁর অতীত দিনের তার কাহিনী শুনছিলাম। সাধারণ ছাত্র থেকে আইনজীবী। পরে জজ। ওটাও একটা লড়াই।কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, টালির ঘরে থাকা বস্তির মেয়ে যখন রাজনীতি নামের খেলায় হারতে হারতে, মার খেতে খেতে, ক্ষমতার শীর্ষে বিচরণ করেন, তখন এলিট সমাজ সেই স্বীকৃতিকে স্বাগত জানাতে কুন্ঠিত হয়। সে সেই লড়াইকে উপহাস করে। যিনি সাধারণ ভাবে জীবন দেখেছেন তিনি তো সেই কথাই বলবেন। আমার ভেতরে শিক্ষা নামের এক ভাইরাস বাসা বেঁধেছে। তিনি অতি সাধারন জন্যই তিনি আক্রমনের সহজলভ্য নিশানা। মুখ্যমন্ত্রী ঠিক কি বলেছেন!! আমি জানি অনেকেই শোনেননি। প্রতিটি সফল ব্যবসায়ীয় মূলধন শুধু এক হাজার টাকা না।
মেহনত!! যা তাকে কোটি টাকার ভরসা যাগায়। মেহনতি মানুষের যিনি প্রতিনিধি, তিনি জানেন অভাবের কথা। তাই তো প্রটোকল না মেনে ফস করে বলেই ফেলেছেন এই সব কথা।
বিশেষ দ্রষ্টব্য ঃ চিড়া, মুড়ি, ছোলা, বাদাম, মুগ ডাল, ছোলার বাহারি আইটেম …… প্যাকেটজাত হয়ে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করে চলেছে।
