রামকৃষ্ণ কথামৃতে পড়েছিলাম অবধূতের কথা। অবধূত অনেককে গুরু বানিয়েছিল। তার মধ্যে একজন ছিল একজন ছিল চিল নামের আমাদের পরিচিত পাখি। অবধূত শিক্ষা নিয়েছিলেন চিলের সেই দৃশ্য দেখে। চিল যখন মুখে মাছ নিয়ে উড়তে শুরু করেছিল ঠিক তখনই পেছন পেছন কয়েকশো কাক সেই চিলের পিছু ধাওয়া করে। মুখে মাছ নিয়ে কোথাও সে বসতে পারছিল না। কারণ কাক তার পিছনে। হঠাৎ চিলের মুখ থেকে মাছটা পড়ে যায়। আর কাক গুলো চিলের পেছনে না গিয়ে পড়ন্ত মাছের প্রতি ধাবমান হয়। চিলএকটি গাছের ডালে বসে নীচের দিকে তাকায়। মাছটা ছিল তার বাসনা।
জীবনে চলার পথে আমিও অনেককে গুরু বানিয়ে নেই। যেমন একজন সাইকেল মেকার। শিশু শ্রমিক। কোন একদিন সাইকেলটা দোকানে দিয়ে, কাজ পছন্দ না হওয়ার দরুন সেই কর্মচারীর মালিক কে ডাকতে বলেছিলাম। এবং প্রভূত অহংকারে বলেছিলাম তোর মালিক কি কি এই ধরনের কাজ শেখাচ্ছে? কর্মচারী শিশুশ্রমিক আঙ্গুল তুলে আমাকে জীবন দর্শন শিখিয়েছিল। “মালিক মালিক বলবেন না। উনি আমার বস। মালিক উপরওয়ালা।”
মেনেছি। হার মেনেছি। শিখেছি। আর শিখছিও। এ শেখার শেষ নেই। জীবন তো পাঠশালা।
আজকে যেমন আমার বন্ধুদের গ্রুপে একজন পোস্ট করেছে।
গল্পটা এইরকম।
একটা ট্রেনে দুজন ব্যক্তিকে উপস্থাপিত করা হয়েছে। একজন শার্ট প্যান্ট পরিহিত ব্যক্তি।যিনি বিজনেস ম্যান। আর একজন ভিক্ষাজীবি।
ভিক্ষাজীবী হাত পাততেই লোকটি বলল, “তুমি সব সময় ভিক্ষা কর এবং মানুষের কাছে চাও, তুমি কি কখনো কাউকে কিছু দাও কি ?”
ভিক্ষাজীবী শুধু অবাকই হলো না বিস্মিত হয়ে বলল, ” আমি শুধু মানুষের কাছে চাইতেই জানি। কাউকে কিছু দিতে জানিনা”
লোকটি উত্তর দিল, “যখন তুমি কাউকে কিছু দিতে জানোনা, তখন তোমার চাওয়ারও কোন অধিকার নেই। আমি একজন ব্যবসায়ী এবং শুধুমাত্র লেনদেনে বিশ্বাসী। “
সত্যিই তো চাওয়ার সাথে সাথে যদি কিছু দেওয়া যায় তাহলে ক্ষতি কি? যে স্টেশনে তার নিবাস তার চতুর্দিকে সে তাকালো। মানুষ আর মানুষ। অনেক দূরে স্টেশনের বাগানে কিছু ফুল ফুটে আছে। সে ভাবলো এই ফুল গুলো যদি বিনিময়ে দেওয়া যায় ক্ষতি কি?
পরদিন থেকে সে যখনই হাত পেতে কিছু চাইত, বিনিময়ে কিছু ফুল তুলে দিত দাতাদের হাতে। এভাবেই চলছিল দিন। পাওয়ার পরিমাণও বাড়ছিল।
একদিন চলন্ত ট্রেনে আবার দেখা সেই ভদ্রলোকের সাথে।
ভিক্ষাজীবীকে দেখে ভদ্রলোক বলে উঠলেন “বাহ তুমি তো দেখি বিজনেসম্যান হয়ে গেছো?”
ভিখারি ট্রেন থেকে নেমে চিন্তা করতে শুরু করলো। আমি কিভাবে বিজনেস ম্যান হলাম? আমি তো ভিক্ষাই করে চলেছি। বিনিময়ে কিছু ফুল তুলে দেই দাতাদের হাতে।
তারপর দিন থেকে সে আর ট্রেনে ভিক্ষা করতে বেরোলো না।
#
পাঁচ বছর পরের কথা।
একই ট্রেন দুজন স্যুট বুট পরিহিত মানুষ মুখোমুখি। একজন এগিয়ে গেল।
“স্যার আমাকে চিনতে পারছেন?”
“না তো।”
“স্যার, আমি সেই ভিক্ষাজীবী। প্রথমবার আপনি বলেছিলেন যখন তুমি কাউকে কিছু দিতে পারো না তখন তোমার চাওয়ার কোন অধিকার নেই।
দ্বিতীয়বার বলেছিলেন আমি নাকি বিজনেসম্যান হয়ে গিয়েছি। স্যার সত্যিই আমি এখন বিজনেসম্যান। ফুলের ব্যবসা করি।”
অবধূত,চিল,ভিক্ষাজীবী বা বিজনেসম্যান এই শব্দগুলো প্রাসঙ্গিক না। আসল কথা Attitude. জীবন নামের পরিধি না জানা বৃত্তের ব্যাসার্ধের পরিমান আমি কি করতে জানি? আমি শুধু বক্ররেখাকে সরল করে দেখার চেষ্টা করি। জীবন নামের বৃত্তের ব্যাস বা ব্যাসার্ধের পরিমাপ কে জানে ????
