কামাখ্যা মন্দির ও কোচবিহারের মহারাজা বিশ্ব সিংহের প্রাচীন কিংবদন্তি – সৌজন্যে সুপ্রিয় নারায়ন

মহারাজ বিশ্বসিংহ গৌহাটীর নিকটবর্তী নীলাচলে অবস্থিত কামাখ্যাপীঠের উদ্ধার সাধন করে সেখানে তাঁর মন্দির প্রস্তুত করিয়া দিয়েছিলেন। কথিত আছে যে, উক্ত পীঠের মন্দির সর্ব্বপ্রথমে নরকাসুর নির্মাণ করেছিলেন; কিন্তু, পরে তা ভগ্ন এবং মৃত্তিকার স্তূপের নিচে বিলুপ্তপ্রায় অবস্থায় পতিত ছিল। উক্ত পর্ব্বতের অধিবাসী কতিপয় নরনারী ঐ স্তূপকে দেবস্থান মনে করে সেখানে শূকর এবং কুক্কুট প্রভৃতিপশু-পক্ষী বলি দিয়ে পূজা করত। কথিত আছে যে, একদা বিশ্বসিংহ ও শিষ্যসিংহ নৈশ অভিযানে পথ ভুলে তাঁদের অনুবর্তী সৈন্যদল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন এবং নানাস্থানে ঘুরতে ঘুরতে অবশেষে নীলাচলের উপর গিয়ে উপস্থিত হন; তাঁরা সেখানে এক মৃত্তিকাস্তূপের সন্নিকটে বৃক্ষমূলে অবস্থিতা এক বৃদ্ধার মুখে জানতে পারেন যে, ঐ স্তূপটি স্থানীয় অধিবাসীগণের দেবস্থান। রাজা তাঁর সৈন্যসামন্তের সাথে পুনম্মিলিত হবার প্রত্যাশায় সেখানে ‘মানত’ করেন এবং খুব তাড়াতাড়ি তাঁর মনস্কামনা সিদ্ধ হয়। উক্তস্থানের এতাদৃশ মাহাত্ম্য দর্শনে রাজা বিস্মিত এবং কৌতূহলাক্রান্ত চিত্তে অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হন এবং পণ্ডিতগণের সাহায্যে এবং শাস্ত্রাদি পাঠে সেই স্থানকে কামাখ্যা মহাপীঠ বলে অবগত হন। স্বকীয় রাজ্য নিষ্কণ্টক হইলে তিনি ঐ পীঠে দেবীর স্বর্ণমন্দির প্রস্তুত করে দিবেন বলে সংকল্প করেছিলেন এবং তাঁর সেই কামনাও পূর্ণ হয়েছিল। উক্ত মৃন্ময় স্তূপের খননকালে সেখানে ধ্বংসাবশিষ্ট প্রাচীন প্রস্তরনির্মিত মন্দিরের নিম্নভাগ এবং মূলপীঠ আবিষ্কৃত হয় এবং রাজা সেই ভগ্নাবশেষের উপরে ইষ্টক দ্বারা নূতন মন্দির প্রস্তুত করে দেন এবং তাঁর প্রতিশ্রুতি পালনের জন্য প্রতি ইষ্টকখণ্ডে এক এক রতি স্বর্ণ প্রদান করেছিলেন, ইত্যাদি জনশ্রুতি আছে। কামাখ্যামন্দির পূর্ব্বপশ্চিমে দীর্ঘ এবং চার অংশে বিভক্ত; গর্ভগৃহ বা মুলমন্দির পুর্ব্বদিকে এবং তার পরে ভোগমূর্তি অথবা চলন্তমূর্তি ও পঞ্চরত্নের গৃহ পর পর অবস্থিত আছে। ঐ সমস্ত গৃহের প্রস্তর নির্মিত অংশ গর্ভগৃহ সহকারে উচ্চতায় যথাক্রমে ২৬ ফিট, ১২ll০ ফিট এবং ১২ ফিট। পরবর্তীকালে মন্দিরটি বিধ্বস্ত প্রায় হলে মহারাজা নরনারায়ণ বিধ্বস্ত প্রায় কামাখ্যামন্দির ভাই তথা প্রধান সেনাপতি শুক্লধ্বজের (চিলারায়) সাহায্যে পুনরায় নির্মাণ করেছিলেন। এই বিখ্যাত মন্দির প্রস্তুতের ভার প্রথমতঃ মহরাম বৈশ্য নামক জনৈক কর্মচারীর উপর অর্পিত হয়েছিল; কিন্তু, অর্থ হরণের অভিযোগে তিনি দোষী অবধারিত হলে সেনাপতি মেঘা মকদুম ঐ কৰ্ম্মে নিযুক্ত হয়ে তা সুসম্পন্ন করেন। মন্দির প্রস্তুত হলে রাজা মহারাণী ভানুমতী এবং শুক্লধ্বজ পত্নী চন্দ্রপ্রভা এবং গৌড়ে বিবাহিতা মহিলাগণের সাথে এবং ঐশ্বর্য্যোচিত আড়ম্বরে নীলাচলে গমন করেছিলেন। দেবীর প্রথম মহাপূজার উপলক্ষে বহুবিধ বলি প্রদত্ত, সেবক সেবাইত নিযুক্ত এবং বহু সম্পত্তি উৎসর্গীকৃত হয়েছিল।
মহারাজ নরনারায়ণ এবং শুক্লধ্বজের প্রস্তরমূর্ত্তি মন্দিরসংলগ্ন চলন্তমূর্তির গৃহে এখনও বিদ্যমান আছে। মূল মন্দিরে প্রবেশপথের বামদিকে শিলালিপিতে মন্দিরনির্মাণের বৃত্তান্ত নিম্নলিখিত শ্লোকাকারে ক্ষোদিত আছে (১৪৮৭ শক, অথবা ১৫৬৫ খৃষ্টাব্দঃ-
“লোকানুগ্রহকারকঃ করুণয়া পার্থো ধনুর্ব্বিদ্যয়া দানেনাপি দধীচিকর্ণসদৃশো মৰ্য্যাদয়াম্ভোনিধিঃ।
নানাশাস্ত্রবিচারচারুচরিতঃ কন্দর্পরূপোজ্জ্বলঃ কামাখ্যাচরণার্চ্চকো বিজয়তে শ্রীমল্লদেবো নৃপঃ৷৷
প্রাসাদমদ্রিদুহিতুশ্চরণারবিন্দ-
ভক্ত্যাকরোতদনুজো বরনীলশৈলে।
শ্রীগুরুদেব ইমমুল্লসিতোপলেন
শাকে তুরঙ্গগজবেদশশাঙ্কসংখ্যে||
উক্ত লিপির নিচে, অপেক্ষাকৃত ছোট অক্ষরে এবং অন্য আরেকটি শিলাপটে নিম্নলিখিত
শ্লোকটিও উৎকীর্ণ আছে :-
“তস্যৈব প্রিয়সোদরঃ পৃথুযশা বীরেন্দ্রমৌলিস্থলী
মাণিক্যং ভজমানকল্পবিটপী নীলাচলে মঞ্জুলম্।
প্রাসাদং মুনিনাগবেদশশভূৎ শাকে শিলারাজিভি-
দেবীভক্তিমতাংবরো রচিতবান্ শ্রীশুক্লপূর্ব্বধ্বজঃ।।”
কামাখ্যাদেবীর সেবাপূজার জন্য রাজা ব্রাহ্মণদের বহু ব্রহ্মোত্তর ভূসম্পত্তি, মন্দিরের ব্যয় বিধানের জন্য যথেষ্ট দেবোত্তর ভূমি এবং সেবকগণের ভরণপোষণের উপযুক্ত ভূমি দান করেছিলেন।

কথিত আছে যে, সান্ধ্য আরতির সময়ে মন্দিরের পুরোহিত মূল মন্দিরের দরজা বন্ধ করে আরতি করতেন। সেই সময় সেই ঘরের থেকে নুপুরের ধ্বনি আসত। এই মন্দিরের আরেক পুরোহিত কেন্দুকলাই মহারাজা নর নারায়ণকে নালিশ করে যে মন্দিরের সন্ধ্যা আরতির নামে জনৈক পুরোহিত দরজা বন্ধ করে নর্তকী এনে নাচ দেখেন। মন্দিরে এরকম ব্যভিচার অবাঞ্ছিত বিবেচনা করে মহারাজা ঠিক করলেন তিনি স্বয়ং গিয়ে তদারকি করবেন এবং একদা মহারাজ নর নারায়ণ কেন্দুকলাই নামক সেই পূজারী ব্রাহ্মণের সাহায্যে সন্ধ্যাবেলা মন্দিরে বাদ্যধ্বনি আরব্ধ হলে লুকিয়ে দরজার একটি ছিদ্র দিয়ে মন্দিরের অভ্যন্তর লক্ষ করতে গিয়ে তিনি নৃত্যপরায়ণা নগ্ন কামাখ্যা দেবীকে দর্শন করলে দেবী তখন অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হন, ‘অতঃপর কুচবিহার রাজগণের কামাখ্যা এবং নগ্ন দেবমূৰ্ত্তিদর্শন নিষিদ্ধ’ বলে
অভিশাপ প্রদান করে বলেন তাদের বংশের কেউ তার মন্দির বা তার প্রতিমা দর্শন করলে তার বংশ নির্বংশ হবে”। সেই পূজারীর তৎক্ষনাৎ মৃত্যু হয়। কামাখ্যা দেবীর দেবোত্তর ২৩,৬৮৫ বিঘা নিষ্কর ভূমি রাজসরকার থেকে প্রাপ্ত হয়েছিল। ১৮৯৭ খৃষ্টাব্দের ভূমিকম্পে কামাখ্যা মন্দিরের অনেক ক্ষতি হওয়ায় তাহার সংস্কারের জন্য কুচবিহার রাজদরবার ৩,২০০ শত টাকার সাহায্য প্রদান করেছিলেন।

Leave a Comment