কোচবিহারের শিব যজ্ঞ মন্দিরের প্রাচীন ঐতিহ্য অক্ষয় তৃতীয়ার সঙ্গে জড়িয়ে আছে

কোচবিহারের রাজ আমলের ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হচ্ছে শিব  যজ্ঞ মন্দির , বিভিন্ন সময়ে কোচবিহারের রাজকুমারী তথা জয়পুরের রাজমাতা গায়ত্রী দেবীর এই মন্দির নিয়ে আবেগ ছিলো অসীম এবং আজও এই মন্দির হচ্ছে কোচবিহারের মানুষের জন্য এক ধর্মতীর্থ। বিভিন্ন সময়ে দেশ ও বিদেশের বহু বিশিষ্ট জনেরা এই মন্দির ভ্রমণে এসে অবাক হয়েছেন, এদের মধ্যে অবশ্যই অন্যতম নাম হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যার রয়েছে এই মন্দিরের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা। কিন্তু কিসের যজ্ঞ? কবে থেকে শুরু এই যজ্ঞের , কে শুরু করেছিলেন , কিসের এত আয়োজন? কোচবিহারের অনেকের কাছেই এই পুরনো স্মৃতিগুলো এখন আবছা হয়ে চলেছে, ছোট্ট একটি মেলা বসে প্রতিবছর ( করণা আবহ ব্যতিক্রম) মন্দির প্রাঙ্গনের ঠিক বাইরে। পুরনো আবছা ইতিহাসের মতন এই পরম্পরাও আধুনিকরণের চাপে ধীরে ধীরে নাম মাত্রই রক্ষা হয়ে চলেছে, কিন্তু এই বছর শিব যজ্ঞে হয়েছে বিশেষ আয়োজন , কারণ এইবার ” ৭৫বছর “।

এই বারের অক্ষয় তৃতীয়া উপলক্ষ্যে কোচবিহার শহর লাগোয়া খাগরাবাড়ি এলাকার রাজ আমলের ঐতিহ্য মেনে শিবযজ্ঞের স্থায়ী মন্দিরে পাঁচদিন ধরে লক্ষ আহুতির ৭৫ তম শিবযজ্ঞ শুরু হলো।

এই মন্দিরের ইতিহাস অনুসারে , ১৯৪৮ সালে কুচবিহার রাজ্যের শেষ স্বাধীন মহারাজা জগদ্দীপেন্দ্র নারায়ণ ভূপবাহাদুরের সভাপতিত্বে আয়োজিত ধর্মসভায় সিদ্ধান্ত মেনে ওই বছর থেকে শিবযজ্ঞ হয়ে আসছে।” শিব যজ্ঞ মন্দিরের  ইতিহাস থেকে জানা যায় , তৎকালীন রাজ্য কুচবিহারের মহারাজের রাজসভার পন্ডিত প্রয়াত ৺রমাশঙ্কর কাব্য ব্যাকরণ স্মৃতিতীর্থ মহাশয় এই শিবযজ্ঞের সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৪৮ – ১৯৫০ সাল পর্যন্ত ১০ জন পূজারী যজ্ঞানুষ্ঠানে সামিল হতেন। ১৯৫১ সাল থেকে ২০ জন পূজারি থাকছেন।

ধর্মপরায়ণ কোচবিহারের শেষ স্বাধীন মহারাজা জগদ্দীপেন্দ্র নারায়ণ ভূপবাহাদুর নিজেও এক সময় ওই “শিবযজ্ঞের উৎসব নিয়ে  ” অনলে লোভ, স্বার্থপরতা, হিংসা পুড়ে যাক” বলে মন্তব্য করেছিলেন। এছাড়াও কুচবিহারের রাজমাতা ইন্দিরা দেবী সাহেবা , মহারাজকুমার ইন্দ্রজিতেন্দ্র নারায়ণ ছাড়াও ১৯৯৫ সালে শিবযজ্ঞ মন্দির নতুন রূপে সংস্কার করার পর সেবছর কুচবিহারের রাজকন্যা ও জয়পুরের রাজমাতা গায়েত্রী দেবী ও তৎপুত্র জয়পুরের ইশরদার রাজা জগৎ সিংহও কুচবিহারের শিবযজ্ঞ মন্দিরের উদ্বোধনের সময় এসেছিলেন।

আবার শাস্ত্র মতে , এইদিন শ্রীকৃষ্ণের চন্দন যাত্রা। সেই উপলক্ষ্যে কুচবিহার রাজবংশের কুলদেবতা শ্রীশ্রী মদনমোহন ঠাকুরের চন্দন যাত্রা উৎসব অনুষ্ঠিত হবে মদনমোহন ঠাকুরবাড়িতে। এই ভাবেই কোচবিহারে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে রাজ ঐতিহ্যের বিভিন্ন গল্প, আজও কোচবিহার তথা উত্তরবঙ্গের মানুষ সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা দিয়ে সেইসব ঐতিহ্য পালন করে আসছেন।
 

Leave a Comment